স্টাফ রিপোর্টার : পাঁচ মাস আগে ভালোবেসে ঘর বেঁধেছিলেন মুসলিমা আক্তার মুন্নি। স্বপ্ন ছিল স্বামীকে নিয়ে সুখের সংসার করবেন, সাজাবেন নিজের ছোট্ট পৃথিবী। কিন্তু সেই স্বপ্নের সংসার স্থায়ী হলো মাত্র পাঁচ মাস। বুধবার রাতে হঠাৎ করেই নিথর হয়ে গেলেন মুন্নি। তার গলায় পাওয়া গেছে রশির দাগ। আর মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনে হাসপাতালে ছুটে এসে স্বজনরা দেখতে পেলেন—প্রিয় মানুষটি আর বেঁচে নেই।
ঘটনাটি ঘটেছে ফরিদপুরের বোয়ালমারী পৌরসভার কলারণ গ্রামে। বুধবার রাতে স্বামীর বাড়িতে মুসলিমা আক্তার মুন্নির মৃত্যু হয়। পরে তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন মরদেহ হাসপাতালে রেখে চলে গেছেন বলে অভিযোগ করেছেন নিহতের পরিবারের সদস্যরা। এ ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া, সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও রহস্যের।
নিহতের পরিবার বলছে, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়; বরং মুন্নিকে হত্যা করে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়েছে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এখনো মৃত্যুকে হত্যা বলে নিশ্চিত করা হয়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ভালোবেসে বিয়ে, পাঁচ মাসেই শেষ হলো সংসার
বোয়ালমারী পৌরসভার আমগ্রামের বাসিন্দা মুরাদ শেখের মেয়ে মুসলিমা আক্তার মুন্নির সঙ্গে কলারণ গ্রামের নুরইসলাম শেখের ছেলে ও পেশায় টাইলস মিস্ত্রী সজল শেখের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্ক গড়ায় বিয়েতে। চলতি বছরের পহেলা রমজান তারা বিয়ে করেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, বিয়ের পর প্রথমদিকে তাদের দাম্পত্য জীবন ভালোই চলছিল। কিন্তু মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় সেই সংসারে নেমে এলো এমন এক পরিণতি, যা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না মুন্নির বাবা-মা ও স্বজনরা।
বুধবার রাতে পরিবারের কাউকে না জানিয়ে মুন্নিকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক শিঞ্জন সাহা তাকে পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন। মুন্নির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজনরা হাসপাতালে ছুটে আসেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে মেয়েকে জীবিত নয়, নিথর অবস্থায় দেখতে হয় তাদের। তার গলায় রশির দাগ দেখে পরিবারের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।
‘আমার মেয়েকে কেন মেরে ফেলল?’
মুন্নির বাবা মুরাদ শেখ কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিযোগ করে বলেন, আমার মেয়েকে মেরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজিয়েছে আমার জামাই। আমার মেয়ের নাক-মুখে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। আমার মেয়েকে কেন ওরা মারল? আমি আমার মেয়ের হত্যার বিচার চাই।
বাবার এই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। মেয়েকে হারানোর শোকের সঙ্গে যোগ হয়েছে মৃত্যুর কারণ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতাল ও আশপাশের পরিবেশ।
নিহতের স্বজনরা অভিযোগ করে বলেন, আমাদের মেয়েকে হত্যা করে গলায় ফাঁস দেওয়ার নাটক সাজিয়ে হাসপাতালে এনে লাশ ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে। যদি কোনো অপরাধ না থাকে, তাহলে তারা লাশ রেখে চলে গেল কেন? আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।
গলায় রশির দাগ, শরীরে আরও কয়েকটি চিহ্ন
মরদেহ উদ্ধারকারী বোয়ালমারী থানার উপপরিদর্শক শরীফ আব্দুর রশিদ বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেছে। প্রাথমিক সুরতহালে নিহতের নাকের ওপর সামান্য কালচে দাগ, গলায় রশির দাগ এবং বাম পায়ের হাঁটুর নিচে একটি দাগ দেখা গেছে।
তিনি বলেন, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মর্গে পাঠানো হবে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হবে। আপাতত থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হবে।
বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, মুসলিমা আক্তার মুন্নির মরদেহ হাসপাতাল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ফরিদপুর মর্গে পাঠানো হবে। ময়নাতদন্ত ও তদন্তে মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা হবে। যদি এটি হত্যা হিসেবে প্রমাণিত হয়, তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মুন্নির মৃত্যু আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড-এ প্রশ্নের উত্তর এখন ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে স্বজন ও স্থানীয়রা। তবে একটি পরিবারের কাছে এরই মধ্যে সবকিছু থমকে গেছে। যে মেয়েটি পাঁচ মাস আগে ভালোবেসে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজ সেই মেয়ের নিথর দেহ ঘিরে স্বজনদের শুধু একটাই আকুতি—মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটন হোক এবং অপরাধী যে-ই হোক, তার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক।