স্টাফ রিপোর্টার: নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বুধবার (২৬ আগস্ট) হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের একটি বড় অংশ ধসে পড়ার পর বরফ, পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোত নেমে এসে নেপালের রসুয়া জেলা ও তিব্বতের গিরং এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। নেপালে অন্তত ১৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তিব্বতের গিরং এলাকায় আরও তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন কয়েক শতাধিক মানুষ।
আকস্মিক এই বন্যায় ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, সীমান্ত যোগাযোগ অবকাঠামো এবং বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রবল স্রোতে বহু যানবাহন ও স্থাপনা ভেসে গেছে। দুর্গত এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
কীভাবে ঘটল ভয়াবহ এই বিপর্যয়
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, তিব্বত অঞ্চলে অনুভূত একটি ভূকম্পন এই দুর্যোগের সূত্রপাত করতে পারে। তবে পরে স্যাটেলাইট ছবি ও ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাহাড়ের উঁচু অংশে একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ উপত্যকায় নেমে আসে। সেই ধস নদীর প্রবাহে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ যুক্ত করে দ্রুতগতির বন্যার সৃষ্টি করে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS)-এর প্রাথমিক তথ্য নিয়ে যে ভূকম্পনকে কেন্দ্র করে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী বিশ্লেষণে সেটি ভূমিকম্পের পরিবর্তে বরফ-পাথরের ধস থেকে সৃষ্ট ভূকম্পীয় সংকেত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। ফলে ভূমিকম্পকে সরাসরি দুর্যোগটির কারণ হিসেবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
নিখোঁজ শত শত মানুষ
বন্যার পর নেপাল ও তিব্বতের দুর্গত এলাকায় বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও রয়েছেন। নেপালে নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন।
তিব্বতের গিরং এলাকাতেও কয়েক শতাধিক মানুষের নিখোঁজ থাকার খবর পাওয়া গেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপের কারণে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধারকারী দলকে ব্যাপক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
যোগাযোগ ও অবকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষতি
প্রবল পানির স্রোত ও কাদার তোড়ে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার বিভিন্ন স্থাপনাও ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধারকারী দল পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থা দুর্গত এলাকায় উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ধ্বংসস্তূপ সরাতে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, কাদা ও পাথরের স্তূপ এবং যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষতির কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে।
নতুন করে বন্যার আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমবাহ ও পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে বরফ-পাথর ধস বা নদীর প্রবাহে কোনো ধরনের বাধা তৈরি হলে আবারও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে নেপাল ও তিব্বতের পাশাপাশি downstream বা ভাটির দিকের এলাকাগুলোতেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
নেপাল থেকে প্রবাহিত নদীগুলোর পানি ভারতেও প্রবেশ করায় সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় দেশটির বিহারসহ ভাটির কয়েকটি এলাকায় সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।
হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছেন। এবারের ভয়াবহ বন্যা সেই ঝুঁকিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।