স্টাফ রিপোর্টার: ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এতে একটি মাদরাসাসহ অন্তত ২৮টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং উভয় পক্ষের প্রায় ৩০ জন আহত হয়েছেন। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার পাচুড়িয়া ইউনিয়নের চরভাটপাড়া উত্তরপাড়া গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। সম্প্রতি ওই বিরোধ নতুন মাত্রা পায়, যখন খায়রুল শেখের মেয়েকে প্রতিপক্ষ গ্রুপের নাছির শেখ নামে এক বখাটে যুবক উত্যক্ত ও শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় খায়রুল শেখ আলফাডাঙ্গা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর থেকেই অভিযুক্ত নাছির শেখ ও তার সহযোগীরা মামলা তুলে নিতে খায়রুল শেখ ও তার পরিবারকে বিভিন্নভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখাতে থাকে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ঘটনার জের ধরে শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকালে সাবেক ইউপি সদস্য হাফিজুর রহমান, আহাদ মেম্বার, বাশি শেখ ও ইশারত শেখের নেতৃত্বে একদল লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সংঘবদ্ধ হামলা চালায়।
হামলাকারীরা একই গ্রামের হাফিজার শেখ, রুহুল আমিন, সরোয়ার শেখ, মো. জামাল শেখ, কাশেম শেখ, সিরাজ শেখ, খায়রুল শেখ ও নজরুল ইসলামসহ একাধিক ব্যক্তির বাড়িঘরে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট করে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামলার সময় ঘরের আসবাবপত্র, মূল্যবান জিনিসপত্র ভেঙে ফেলা হয় এবং নগদ অর্থ ও মালামাল লুট করা হয়।
এ সময় হামলাকারীদের তাণ্ডব থেকে রক্ষা পায়নি স্থানীয় একটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-আল্লামা জহুরুল ইসলাম (রহ.) তায়ালিমুল কোরআন ইসলামিয়া মাদরাসা।
মাদরাসাটিতে হামলা চালিয়ে দরজা-জানালা ভাঙচুর করা হয়, ফলে সেখানে পাঠদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, অন্তত ২৮টি বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে এবং ৮টি বাড়ির বিদ্যুতের মিটার ভাঙচুর করা হয়েছে। এতে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে তারা জানান।
খায়রুল শেখ বলেন, আমার মেয়ের শ্লীলতাহানির বিচার চেয়ে থানায় মামলা করায় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। মামলা তুলে নিতে আমাকে নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। আমি রাজি না হওয়ায় পরিকল্পিতভাবে আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়। বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে, এমনকি মাদরাসাটিও রেহাই পায়নি। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চরভাটপাড়া এলাকায় ২-৩ কিলোমিটারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। এলাকার পিছিয়ে পড়া শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ করে দিতে ওই মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলায় সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা রকিবুল ইসলাম বলেন, আমরা অবহেলিত এলাকার শিশুদের মাঝে দ্বীনি শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে এই মাদরাসা গড়ে তুলেছি। কিন্তু সেটিও হামলার শিকার হলো। এখন একটি মাত্র ঘর রয়েছে, সেটিও জরাজীর্ণ। এই অবস্থায় পাঠদান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা এর সঠিক বিচার চাই।
অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষের সাবেক মেম্বার হাফিজার শেখ মুঠোফোনে বলেন, আমি তখন অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ছিলাম। তবে আমার বাড়িতেও হামলা হয়েছে। আমাদের লোকজন কী করেছে, তা আমার জানা নেই।
ইশারত শেখ দাবি করেন, শুক্রবার সকালে খায়রুলদের লোকজন আমার ওপর ও বাড়িতে হামলা চালায়। এরপর শনিবার আমাদের লোকজন প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা আগে হামলা না করলে এমন ঘটনা ঘটত না।
এ বিষয়ে আলফাডাঙ্গা থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার পর উভয় পক্ষই পৃথক মামলা দায়ের করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় পুলিশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। যেকোনো সময় নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় স্থানীয়রা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।