রবিউল ইসলাম রুবেল : একসময় মধুমতি নদী নামটি ছিল নদীপাড়ের মানুষের কাছে আতঙ্কের প্রতীক। বর্ষা এলেই বুক কেঁপে উঠত, রাতের ঘুম উড়ে যেত। কে জানে, সকালে ঘুম ভাঙলে নিজের ঘরটুকু থাকবে কি না! কত মা-বাবার চোখের সামনে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বসতভিটা, কত শিশুর স্কুল, কত কৃষকের শেষ সম্বল ফসলি জমি তার হিসাব নেই। সেই ভয়াল মধুমতির বুকেই এখন জেগে উঠছে নতুন আশার গল্প।
ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী উপজেলার হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাস, কান্না আর সংগ্রামের সাক্ষী এই নদী। বছরের পর বছর ভাঙনের কাছে হার মানতে হয়েছে তাদের। কেউ হারিয়েছেন পৈতৃক ভিটা, কেউ হারিয়েছেন মসজিদ, রাস্তা, স্কুল আবার কেউ নদীর গর্ভে হারিয়েছেন জীবনের সব সঞ্চয়।
কিন্তু এবার যেন সেই কান্নার দিন পেছনে ফেলে সামনে এগোচ্ছে নদীপাড়ের মানুষ। ৪৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হয়েছে মধুমতির তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ। প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার জুড়ে এই বিশাল প্রকল্প যেন শুধু একটি বাঁধ নয়, এটি হাজারো পরিবারের নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষার আশ্বাস, আর হারানো নিরাপত্তা ফিরে পাওয়ার গল্প।
আলফাডাঙ্গার গোপালপুর ইউনিয়নের দিকনগর, বাজড়া, বানা ইউনিয়নের বাঁশতলা, দেউলী, দক্ষিণচরনারাণদিয়া, পশ্চিম চরনায়ণদিয়া, বোয়ালমারী উপজেলা, মধুখালী উপজেলার নওপাড়া, কামারখালী, সালামতপুর বীর শ্রেষ্ঠ আব্দুর রউফের গ্রামে এখন প্রতিদিন দেখা যায় এক অন্যরকম দৃশ্য। বিশাল ভেকু মেশিন নদীর পাড় কাটছে, ট্রলারে করে আসছে কংক্রিটের ব্লক, শ্রমিকরা কাঁধে করে সেই ব্লক বসিয়ে দিচ্ছেন নদীতীরে। কেউ জিওব্যাগ ফেলছেন, কেউ কাজের তদারকি করছেন। চারদিকে যেন উৎসবের আমেজ, কারণ এই কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন।
স্থানীয় বৃদ্ধ ভগিরতচন্দ্র রাজবংশীর চোখে জল চিকচিক করে ওঠে। তিনি বলেন, আমাদের পুরোনো বাড়ি ছিল নদীর ওপারে। মধুমতি সব নিয়ে গেছে। একের পর এক ভাঙতে ভাঙতে আমরা এখানে এসে ঠাঁই নিয়েছি। এখানেও যখন ভাঙন শুরু হলো, মনে হয়েছিল আর বাঁচবো না। এখন এই বাঁধ দেখে মনে হচ্ছে, হয়তো আমাদের ছেলেমেয়েরা অন্তত শান্তিতে থাকতে পারবে।
স্থানীয়রা বলছেন, স্বাধীনতার পর থেকে কত নেতা, কত জনপ্রতিনিধির কাছে গেছেন তারা। কতবার হাতজোড় করে বলেছেন, “আমাদের ভিটেটুকু বাঁচান।” কিন্তু বছরের পর বছর কেটে গেছে, নদী শুধু কেড়ে নিয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো স্থায়ী সমাধানের কাজ শুরু হওয়ায় তাদের চোখে ফুটেছে নতুন স্বপ্ন।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড– উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. মজিবুর রহমান জানান, ২৮টি প্যাকেজের আওতায় প্রকল্পটির প্রায় ৮৫ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। দুই তিন মাসের ভেতর পুরো প্যাকেজের কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই বাঁধ শুধু নদীভাঙন রোধ করবে না, মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করবে। আমরা চাই, এই অঞ্চলের মানুষ আর কখনও নদীভাঙনের আতঙ্কে না থাকুক।
বাঁধের কাজ শেষ হলে শুধু ভাঙন থামবে না বদলে যাবে পুরো জনপদের চিত্র। নদীর ঘাট হবে নান্দনিক, গড়ে উঠতে পারে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা। যেসব মানুষ এতদিন নদীর তাণ্ডবে অসহায় ছিলেন, তারাই হয়তো একদিন এই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে গর্ব করে বলবেন— এই নদী আর আমাদের কাঁদায় না, এখন সে আমাদের স্বপ্ন দেখায়।