প্রিন্ট ভিউ
জহির রায়হান কাউনিয়া (রংপুর)প্রতিনিধিঃ আমার স্বামীর স্বপ্ন ছিল গ্রামে একখন্ড জমি কিনে সেখানে পাকা ঘর বাড়ি তৈরি করে দু'মেয়েকে ধুমধাম করে বিয়ে দিয়ে বাকী জীবন গ্রামেই থাকবেন। কিন্তু তার সে ইচ্ছা ও স্বপ্ন কোনটাই পূরন হলোনা। তার আগে ঢাকার আজিমপুরে ৫ আগষ্ট মিছিলে গিয়ে পুলিশের গুলিতে শহিদ হন লাবলু মিয়া।
কান্না জড়িত কন্ঠে এ কথা গুলো বলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ঢাকার আজিমপুরে স্বৈরাচার সরকারের পুলিশের গুলিতে নিহত শহিদ লাবলু মিয়ার স্ত্রী নুরুন্নাহার বেগম। তিনি বলেন আমার স্বামীর কী এমন অপরাধ ছিল তাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করতে হবে। সে তো কোন রাজনীতি করত না পেটের দায়ে ঢাকায় বিভিন্ন স্থানে ফেরি করে ভাংরি জিনিস পত্র ক্রয়- বিক্রয় করে সংসার জীবন চালাত। ৫ আগস্ট ঢাকার আজিমপুরে সবার সাথে মিছিলে অংশ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ গুলি করে আমার স্বামীকে হত্যা করে। খবর পেয়ে আমার দেবর সহ গিয়ে ঢাকার আজিমপুরের একটি হাসপাতাল থেকে তার লাশ শনাক্ত করে পরদিন লাশ নিয়ে কাউনিয়ার হারাগাছ পৌর সভার মোল্লাটারী গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এসে তার বাবার কবরের পাশে দাফন করি।
শহীদ লাবলু মিয়ার বৃদ্ধ মা লাইলী বেগম কান্না জড়িত কন্ঠে আঞ্চলিক ভাষায় বলেন মোর বাবাটাক দুনিয়াত থুইয়া মোক আল্লায় নেলে না কেনে, বউ ছাওয়া গুলাক এলা খায় দেখে কায় খোওয়ায়। ইয়ার আগত ছোট বেটাক কুকুর কামড়েয়া মারি ফেলাইছে। মোর কপালত খালি কী এগলা লেখা আছিলও। মোর বাবাটার জন্য আর বউ নাতি নাতনির জন্য সবায় দোয়া করমেন।
স্ত্রী নুরুন্নাহার বেগম জানান তার স্বামী ঢাকা উত্তরার পাশে দিয়াবাড়ি বালুরমাঠ সংলগ্ন হাসু বটতলা এলাকায় বাসা ভাড়া করে সন্তানদের সাথে নিয়ে বসবাস করতাম। আমার স্বামী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভাংরি মালামাল ফেরি করে ক্রয় -বিক্রয় করে জীবন সংসার চালাতো। বড় মেয়ে লাইজু আক্তার জেসমিন (১৭)ছোট মেয়ে লিজা আক্তার(১৫)কে আর্থিক সংকটের কারণে তেমন পড়ালেখা করাতে পারে নাই। তাই বড় মেয়ে কে সংসারে কিছুটা অর্থের যোগান দিতে ফরিদপুরে চাচাদের সাথে একটি মিলে চাকুরীতে ঢুকান। ছোট ছেলে নুর হাবীব কে স্কুলে ভর্তি করানো হয়, পাশাপাশি মাদ্রাসাতেও সে পড়তো । তার স্বামী প্রায় বলতো ঢাকাতে আর বেশি দিন থাকবো না, গ্রামে গিয়ে কয়েক শতক জমি কিনে ঘর-বাড়ি করে মেয়ে দুইটা কে ধুমধামে বিয়ে দেব। আর ছেলে টা যতদূর ইচ্ছা পড়তে থাকবে। কিন্তু তার স্বপ্ন তে পূরণ হলো না। স্বামীর মৃত্যুর পর লাশ নিয়ে স্বামীর গ্রামের বাড়ি হারাগাছ মায়াবাজার মোল্লাটারীতে গিয়ে তার পিতার কবরের পাশে তাকে কবরস্থ করা হয়। স্বামীর মৃত্যুর পর শশ্বড়ের বাড়িতে কোন রকমে তিন চার দিন থাকার পর দেবর-ভাবীরা সবাই মিলে সেখান তাদের বের করে দেন। কোন উপায়ন্তর না পেয়ে সারাই গফুরটারীতে বাসা ভাড়া করে সন্তানদের সাথে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। সরকারের দেওয়া ১০ লক্ষ টাকার প্রায় অর্ধেক অংশ দেবর, ননদ শ্বাশুড়ি মিলে ভাগ করে নেন।
সেই সাথে দেবরা আরো টাকা দাবী করে নানা ভাবে তাদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে।
কোন রকমে দুই মেয়ে কে বিয়ে দিতে পারলেও যৌতুকের টাকা এখনো পরিশোধ করতে পারেনি তিনি। ফলে মেয়েরা বাবার বাড়িতে অবস্থান করছেন। কোন প্রকার আয় রোজকার না থাকায় ছোট ছেলের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে পড়েছে
শহিদ লাবলু মিয়ার স্ত্রী নুরুন্নাহারের সরকারের কাছে আকুতি জানিয়েছেন তাকে যেন রংপুর শহরের পাশে সিগারেট কোম্পানি এলাকায় একখন্ড জমিতে থাকার জন্য ঘর-বাড়ি নির্মাণ করে দেন। তা হলে তিনি প্রতিমাসে ৫ হাজার টাকা করে বাড়ি দেওয়া থেকে বাঁচতো এবং তার স্বামীর যে স্বপ্ন ছিল তা কিছু টা হলেও পূরুণ হতো।